(১)
লেখার বাংলা ভাষা ও বাংলা লেখার ভাষা দুইটা এক বিষয় না। লেখার যেই বাংলা ভাষা সেইটা একটা সিস্টেম, ভাষা, ফরাসিতে লাংগ্। বাংলারে লেখার ভাষা আদৌ ভাষা কিনা, এই নিয়া সন্দেহ থাকে, এবং সেই সন্দেহ মোতাবেক বাংলা লেখার ভাষা কোনো ভাষা না, একটা তরিকা।
আজি হতে শতবর্ষরও আগে, রবীন্দ্রনাথ ‘চলতি ও সাধু ভাষা’ নামক প্রবন্ধে লিখছেন ‘কথার ভাষায় বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে’। উনিশ শতকে বাংলা লেখার তরিকা উদ্ভাবনের কালে তার এই বাক্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেন? সেইটার একটু আভাস দেয়া যাক।
পাশ্চাত্যের টীকাকার এবং আমাদের মুদ্রাদোষ জাক দেরিদা নানা কালে দেখাইছেন লেখার উপরে কথার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্লাতোন হইতে ক্লওদ্ লেভি স্ত্রস কে না করে নাই। কথা তাদের কাছে প্রাথমিক চিহ্ন। লেখা সেই কথারও চিহ্নমাত্র। চিহ্নস্য চিহ্ন! কথা তাদের কাছে কোনো কোনো বোতলজাত খনিজ পানির বিজ্ঞাপনের মতন প্রাকৃতিক, বিশুদ্ধ, শ্রেষ্ঠ। লেখা দ্বিতীয় শ্রেণীর ঘটনা। কথা আল্লা। লেখা মানুষটানুষ। দেরিদা লিখছেন আরেকটু ভাবলেই কথা/লেখার এইসব উঁচনিচ বিভেদ আসলে টিকে না। কথা বা লেখার কোনোটাই প্রাকৃতিক না, বিশুদ্ধ না, শ্রেষ্ঠ না, অথবা দুইটাই প্রাকৃতিক, বিশুদ্ধ, শ্রেষ্ঠ। দেরিদার এই প্রস্তাব প্রচলিত কথা/লেখার উঁচনিচ বিচারের (বিনির্মাণ?) বিরুদ্ধে গিয়া অবিচার (অবিনিমার্ণ?) ঘটায়। রবীন্দ্রনাথও সময়ের অভাবে দেরিদা না পইড়া কথা/লেখার এই বিচার এইটা উল্টাইছেন।
(২)
এখন প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ আসলেই কি উল্টাইছেন?
অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ লেখাপড়া জানা লোকের প্রসঙ্গেই ঐ কথাটা লিখছেন। তাও এখনকার চ্যাটিং, ফেসবুক, টুইটার, ব্রেকিং নিউজ, স্টকএক্সচেঞ্জের টিকারবেষ্টিত লেখাপড়া জানা লোক না, তখনকার লেখাপড়া লোক, যারা ফলশ্রুতি (শাস্ত্র শুনার ফল) বলতে ফলাফল বুঝাইত। তাদের জন্যই ‘কথার ভাষায় বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে’? অর্থাৎ লিখার ভাষা একটা ধার্য হইছে, কথার ভাষার আমল তদানুযায়ী হইবে? তাইলে প্লাতোন হইতে লেভি স্ত্রস- শব্দব্রহ্মের চিরকালের একাধিপত্ব ব্রাহ্ম ঠাকুরে উল্টাইয়া দিল? না, খুব একটা উল্টায় নাই। কারণ, রবীন্দ্রনাথের লেখার ভাষাটা প্রায় রবীন্দ্রনাথেরই কথার ভাষা থাইকা আসছে। সুতরাং, ‘কথার ভাষায় বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে’ মানে, এইখানে, কথা টু কথা ভায়া লেখা। লেখার কাজ দ্বিতীয় কথাটা যেন প্রথম কথাটার মতন হয় এইটুক নিশ্চিত করা খালি।
এই তথ্য নতুন না আর যে চলিত ভাষা যেইটা লিখার ভাষা হিসাবে উনিশ শতকে কলকাতায় জন্ম নিছে সেইটার সাথে পূর্ববঙ্গের বিবিধ জনভাষার বিস্তর পার্থক্য আছে। যাদের জন্য নতুন, তারা রবীন্দ্রনাথের পূর্বোক্ত রচনায় দেখতে পারেন, ‘আমাদের' ভাষা নিয়া নানান আলোচনায় মাঝে মাঝে ‘ব্যতিক্রম’ হিসাবের পূর্ববঙ্গের প্রসঙ্গ নাম ধইরা আসছে।
কিন্তু এই তথ্য আমাদের মাথায় বেশি একটা ঢুকে নাই, লেখার ভাষা হিসাবে জন্ম নেয়া চলিত ভাষা (দেখেন আমরা প্রায়শই চলিত রীতিকে চলিত ভাষা বলি, এই প্রবণতায় বুঝা যায়, রীতি বা পূর্বোক্ত ‘তরিকা’কে আমরা ভাষার মর্যাদা দিতে ব্যকুল) নতুন একটা মুখের ভাষারও জন্ম দিছে। পূর্ববঙ্গের সাপেক্ষে এই মুখের ভাষা, বৃহৎ বঙ্গের (দীনেশচন্দ্র সেনের এই শব্দবন্ধ আমার ভালো লাগে) অন্যে যেকোনো জায়গার চে ভাষা কম, তরিকা বেশি । তাইলে রবীন্দ্রনাথের কথাটা স্পষ্ট হইল কি না? ‘কথার ভাষায় বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে’?
এইখানে, আলোচনাটাকে দুইভাগা কইরা একভাগা বাদ দিয়া নিলে সুবিধা। প্রথমভাগ, যেইটা নিয়া আমার বিশেষ আগ্রহ এই মুহূর্তে নাই সেইটা হইল এই ঘটনা: ‘কলকতা শহরের নিকটবর্তী চারদিকের ভাষা স্বভাবতই বাংলাদেশের সকলদেশী ভাষা বলে গণ্য হয়েছে। এই এক ভাষার সর্বজনীনতা বাংলাদেশের কল্যাণের বিষয় বলেই মনে করা উচিৎ’। এই কথাসমূহ রবীন্দ্রনাথের একই প্রবন্ধে লেখা আছে। এত্ত স্বাভাবিক, কল্যাণকর ও উচিৎ বিষয় নিয়া লিখতে মন চায় না। কিন্তু দ্বিতীয়ভাগ, লেখার ভাষা কথার ভাষার কোনটা কীসের মাপে হইছে সেইটা নিয়া সেইটা নিয়া আমার আগ্রহ হইতেছে।
(৩)
কথার ভাষার ক্ষুদ্রতম একক ধ্বনিমূল, ফোনেম। লেখার ভাষার ক্ষুদ্রতম একক বর্ণ। মোটাদাগে এইকথা মানা যায়। রবীন্দ্রনাথ ‘ঠাঁই’ শব্দে চন্দ্রবিন্দু থাকার ব্যখ্যা দিতেছেন। এই শব্দে চন্দ্রবিন্দু কোত্থেকে আসছে? রবীন্দ্রনাথ লিখছে, “প্রাচীন সাহিত্যে অনেক শব্দ পাওয়া যায় অন্তিমে যার ঞ-ই ছিল আশ্রয়, যেমন: নাঞি মুঞি খাঞা হঞা। এই জাতীয় অসমাপিকা ক্রিয়া মাত্রেই ঞা’র প্রভুত্ব ছিল।আমার বিশ্বাস, এটা রাঢ় দেশের লেখক ও লিপিকারদের অভ্যস্ত ব্যবহার”। অর্থাৎ দাঁড়াইল এই, ঠাঁই শব্দের চন্দ্রবিন্দুর উৎস ‘লেখক’ ও ‘লিপিকারগণ’, তারা ‘রাঢ় দেশের’। রাঢ় দেশ বীরভূম জেলা, বর্ধমান জেলার মধ্যভাগ, বাঁকুড়া জেলার পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব ভাগ ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমভাগ ইত্যাদি। এইটুক পাঠে অতএব মনে হয়, হইতেই পারে, লেখার ভাষা যেন কোনো কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দুর উচ্চারণের দায় নেয়। অতএব যার কথার ভাষায় চন্দ্রবিন্দু নাই, তার নাক দিয়া চন্দ্রবিন্দু বাইর করাটা, অন্য কারো কথার ভাষার নকল না বরং, ‘লেখক’ ও ‘লিপিকারগণের’ অনুসরণ। রবীন্দ্রনাথের কথার ভাষা, পূর্ববঙ্গের নাকের ভাষার দায়িত্ব নিতে চায় না। এই উপায়েও লিখিত ভাষায় কখনো কখনো চন্দ্রবিন্দুর ঠাঁই হয়, যদিও রবীন্দ্রনাথে এর পরপরই লিখছেন “আনুনাসিক বর্জনের জন্যেই পূর্ববঙ্গ বিখ্যাত”।
(৪)
এখন আসি, ‘বর্জন’ বলতে কি বুঝাইল? বানান থাইকা বর্জন? নিশ্চয়ই না। উচ্চারণ থাইকা বর্জন। মানে, বানানরে উচ্চারণের নির্দেশ মনে করা হইছে। ‘কথার ভাষায় বদল চলছে লেখার ভাষার মাপে’। কিন্তু সেই লেখার ভাষা যে আগেই রবীন্দ্রনাথের কথার ভাষা মাপে তৈরি হইয়া আছে ...
এস্থলে আমার প্রস্তাব হইল, কথিত লেখার ভাষার অঙ্গ যেই বর্ণমালা তার ‘ছ’ বর্ণের ইতিহাস থাইকা এইটা বুঝা যে, পূর্ববঙ্গের কথার ভাষা ‘মান’ লেখার ভাষাতে কেমনে পাইকারি হারে বর্জিত হইছে। এখন বলতে পারো, পূর্ববঙ্গে তো আর একটা কথার ভাষা নাই। তাইলে মনে করাই ‘কলকতা শহরের নিকটবর্তী চারদিকের ভাষা’ও একটা না। কলকাতার চারিদিকেও কেবল বাঁকুড়া না, বাঁকুড়ার সমান দূরত্ব উত্তরপূর্ব মুখে আগাইলে ফরিদপুর জেলাতেও পৌঁছানো যায়। এবং আপাতত পূর্ববঙ্গের কথার ভাষা বলতে পূর্ববঙ্গের সকল কথার ভাষার মধ্যে যেইসব মিল আছে সেইগুলারে একত্রে ধরি।
‘ছ’ বর্ণের ইতিহাস পূর্ববঙ্গের কথার ভাষাকে অগ্রাহ্য করার ইতিহাস।‘ছ’ বর্ণ বহন করে পূর্ববঙ্গের বিবিধ মানুষের মুখের ভাষার উপর দীর্ঘকালের বর্ণবাদী, শ্রেণীবাদী ও সাম্প্রদায়িক হামলার চিহ্ন।
পুনশ্চ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ছ’বর্ণের উপরে এই বর্ণবাদী, শ্রেণীবাদী ও সাম্প্রদায়িক হামলা চালান নাই। চালান নাই। চালান নাই। সুতরাং, অত্র রচনা হইতে রবীন্দ্রনাথের প্রস্থান ঘটিল। (পর্ব: ১ সমাপ্ত)
মন্তব্য
অসাধারণ! লেখাটাতে এ্যাত্ত কিছু উঠে এসেছে যে চেখে দেখতেই বেলা চলে যাচ্ছে! ভেবে দেখতে গেলে কী হবে!
এই বাক্যটা কেমন জানি লাগলো। এখানে বাংলা লেখার ভাষা ... এরকম হবে না?
পরের পর্বের জন্য তর সচ্ছে না।
------------------------
[ওয়েবসাইট] [ফেইসবুক] [ফ্লিকার ]
এইরকমও হইতে পারে। আবার ঐ যে আপানারে ধন্যবাদ দেয়ার ভাষা আমার নাই, সেইরকমই বাংলারে লেখার ভাষা আর কী
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
তাড়াতাড়ি পরের পর্ব ছাইড়েন। ঝুলায় রাখলে খবর আছে।
------------------------
[ওয়েবসাইট] [ফেইসবুক] [ফ্লিকার ]
পরের সপ্তায়
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
ছমেৎকার! ছলুক!
সায়াপথ
এই ছেন্টেঞ্ছটা ভাল্লাগছে।
_____________________
আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।
ছেণ্টেঞ্ছ, ইংরেজি শব্দে ণত্ববিধান ফলাইলাম
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
ণ আমার দুই চক্ষের বিষ!
_____________________
আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।
’
কল্যাণকর না তো।
ছহিনামা হচ্ছে মনে হল। পরের পর্ব আসুক তাড়াতাড়ি।
আহমদ ছফার "ছফা" বানান লেখার ঔদ্ধত্য ভাল পাই।
জায়গায় জায়গায় ঔদ্ধত্য প্রয়োজন ...
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
কঠিন! খুব্বাল্লাগসে!
সবাই দেখি "ছ" নিয়া মাতছে...
চলুক...
লেখাটা দারুণ লাগলো
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
আহা! এমন প্রত্যেকটা বর্ণকে ধরে ধরে তার ইতিহাস ফর্দাফাই করতে পারলে বাংলা বানান, শব্দরূপ, ভাষা এগুলোতে লুকিয়ে থাকা অগ্রহনযোগ্য ও বর্জনীয় ব্যাপারগুলোকে তুলোধুনো করা যেতো। কবি অঞ্জন আচার্যের কাছে শুনলাম ছয় জনের একটা টিম বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বাংলা শব্দের উৎপত্তি নিয়ে কাজ করছেন। কাজটা আদৌ কখনো শেষ হলে শব্দগুলোকেও ফর্দাফাই করা যেতো।
সিরিজ চলুক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের গতিতে।
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।
টি-টোয়েন্টিও ক্রিকেট নাকি
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
চলুক
...........................
Every Picture Tells a Story
ছলুক!
________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"
ছুন্দর।
সব কথা ভাল্লাগবে না। এইটা 'লাইগা গেছে' তাই না
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
ছলুক!
নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)
নাকি আল্লার আর তার নবী- দ্যা মেসেঞ্জার। দ্বিতীয়জন প্রথমজনরে প্রকাশ করে মাত্র ।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।
আল্লা আর তার বাদবাকী সৃষ্টি ... logos মোরশেদ ভাই
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
হেথায় দেখি deconstruction ও আছে।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।
আবার জিগস্
রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটুক
নতুন মন্তব্য করুন