প্রদোষচন্দ্র মিত্র নামের মানুষটিকে আমার অতিমানব বলে মনে হত, চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠত জ্বলন্ত চারমিনার হাতে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকা এক যুবক, দুর্ধর্ষ শত্রু মগনলাল মেঘরাজকে নাস্তানাবুদ করার প্ল্যান আঁটতে থাকা, তার সাথে তোপসে আর লালমোহনবাবুকে আমি সত্যি সত্যি হিংসা করতাম। তখন আমি ছিলাম এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দা, অনন্যসাধারন সেই জগতে এই ত্রিরত্নের সাথে আমি নিয়মিত ঘুরে বেড়াতাম কখনও বোম্বাই, কখনও কাঠমুন্ডু কখনও বা সুদূর লন্ডন। ফেলু মিত্তির যখন হাতে রিভলভার নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে তখন ঠিক তার পিছেই প্রান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতাম আমি নিজে। সেই অদ্ভুত জগতে প্রাণ বাজি নিয়ে বনে-বাদাড়ে ছুটে বেড়ানোর মাঝে এক তীব্র আকর্ষণ ছিল। সেই আকর্ষণ আমাকে চুম্বকের মত টানত, সেই টান আমি যেন এখনও অনুভব করি।
গোল চশমা চোখে টেকো মাথার বিজ্ঞানীটি যখন মঙ্গল গ্রহে যাত্রা করবেই বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, যা হবার হবে ভেবে আমিও প্রস্তুত ছিলাম বৈকি। সেখানেই কি শেষ! মিশর এর পিরামিড থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পিছু নিয়েছিলাম সেই বিজ্ঞানীর। প্রফেসর শঙ্কুর আশ্চর্য খোকা যখন বিশাল বিশাল কাণ্ড করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে তখন স্রেফ ক্লাসের অঙ্ক না মেলাতে পারার দুঃখে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে হত।
আমার জীবনে ফেলুদা কিংবা শঙ্কু এরা কখনই শুধু গল্পের চরিত্র হিসেবেই থেমে থাকেনি, হয়ত আমার মত অজস্র পাঠকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে নিজেদের অজান্তেই। তাই কখনও অলস দুপুরে নিজের কাঠপেন্সিলটাকে চারমিনার ভেবে দাঁতের ফাঁকে গুঁজে রাখতাম, কখনওবা শঙ্কুর অ্যানাইহিলিন পিস্তল দিয়ে অদৃশ্য শত্রু তাড়িয়ে বেড়াতাম। স্রষ্টা সত্যজিৎ এর সাথে পরিচয় এভাবেই।
লোকটা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত জাদুকর ছিল। ইন্দ্রজাল তৈরির এমন ক্ষমতা কজনের হয়! পাঠককে গল্পের জগতে চরিত্রগুলোর অংশীদার করে দাঁড় করিয়ে দেয়ার ক্ষমতা খুব অল্প মানুষেরই হয়। সত্যজিৎ তা অনায়াসে করে গেছেন।
শুধু কি গল্প কিংবা উপন্যাস? তাঁর হাতে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো কি কোন অংশে কম কিংবা অসাধারণ স্কেচ? সোনার কেল্লার জাতিস্মর সেই ছোট্ট মুকুলকে কি কেউ ভুলতে পারে কিংবা পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার কাশ বনের মাঝ দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেই ট্রেন দেখা। সত্যজিৎ রায়ের জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তাঁর সৃষ্ট সবকিছুই অনবদ্য। আকিরা কুরোসাওয়ার বলেছিলেন : "সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা।"
সময় খুব দ্রুত এগিয়ে যায়। সেই কৈশোর পেরিয়েছে অনেক দিন, বহু জটিলতা আর ব্যাস্ততার মাঝে তাই এখন ফেলু মিত্তির রহস্যবিহীন অলস সময় কাটায়, শঙ্কুর গবেষণাও স্থগিত বহুদিন। তারিণীখুড়োও আর গল্প করেনা আগের মত। সিধু জ্যাঠার কাছেও গিয়েছিলাম সেই কবে! ধুলো মাখা বইয়ের তাকে “বাছাই বারো” সেই কবে থেকে অপেক্ষায়। পরিচিত সেই জগত এখন বদলে গেছে অনেক।
ফি-বছর সত্যজিৎ রায় এর জন্মদিন আসে, এবারও এসেছে। নগণ্য একজন পাঠক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করি। চারিদিকে অজস্র দুর্ঘটনা-শঙ্কা-উদ্বেগ এর মাঝে ফেলুদা কিংবা শঙ্কুর মত কিছু চরিত্রের অভাব যেন একটু বেশিই অনুভূত হয় এখন। দমবন্ধ করা বর্তমানে, ফেলে আসা কৈশোরের নিত্যসঙ্গীদের যেন অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে বেড়াই।
স্মৃতিকাতরতায় মাঝে মাঝে মনে হয়, বাস্তবটা যদি সত্যজিৎ এর গল্পের জগতের মত বদলে দেয়া যেত !
মন্তব্য
মানুষের মধ্যে বহুমুখী প্রতিভাবান সৃষ্টিশীলদের আমি ঈশ্বর মানি। সত্যজিৎ এরকম একজন ঈশ্বর। যেখানেই হাত দিয়েছেন দ্যুতি ছড়িয়েছে তা।রবীন্দ্রনাথের পর তাঁর মতন এমন প্রতিভাবান বাঙালি আর কেউ ছিলেন বা আছেন বলে আমার মনে হয়না। কই ডুব মারলে হে ব্রাদার?
অন্ধকার এসে বিশ্বচরাচর ঢেকে দেওয়ার পরেই
আমি দেখতে পাই একটি দুটি তিনটি তারা জ্বলছে আকাশে।।
ধন্যবাদ সুমাদ্রীদা, রবীন্দ্রনাথ এর পরে সত্যজিৎ এর মত এমন বহুমুখী প্রতিভা আসলেই কম দেখেছে বাঙালি।
[ডুব মারিনি, আছি একরকম]
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
সৃষ্টিকর্তা এইসব লোককে বেশি বেশি করে প্রতিভা দিতে গিয়ে আমাদের মত মানুষকে গরুর কাছাকাছি ব্রেইন দিয়ে পাঠাইছে। অসম বন্টন মানি না, মানবো না। এত বস্ হয় কেম্নে মানুষ।
~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~
হাছা কথা
---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।
আসলেই এত বস কেম্নে হয় মানুষ !
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
কেবল ব্রেইন? তার হাইট, চেহারা, অ্যাপিয়ারেন্স - কোন দিকে খামতি আছে? একি অন্যায় নয়? ঘোর ঘোরতর অন্যায়!
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।
হ।
________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"
________________________________________
"আষাঢ় সজলঘন আঁধারে, ভাবে বসি দুরাশার ধেয়ানে--
আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে, ফাগুনেরে মোর পাশে কে আনে"
বস লুক !
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
একটা ব্যানার ডিউ রইল জন্মদিনের - - -
আমি ভাবছি কালকে আপ্নে ব্যানার দিবেন, পরে একবার ভাবলাম আপ্নারে ফেবুতে খোঁচা দেই। পরে আর মনে ছিল না।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
চেহারা অ্যাপিয়ারেন্স নিয়ে আক্ষেপ নাই, উনি বিপরীত লিঙ্গের বলে
~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~
হাইটটা একটু অতিরিক্ত, ফেলু মিত্তিরের মতো 'প্রায় ছয়' হলে আরো ভাল লাগত। কিন্তু স্রষ্টার হাইট সৃষ্টির চেয়ে একটু বেশিই হয়!
নির্ঝর অলয়
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
।ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ অভ্র।
ধন্যবাদ জাহিদ ভাই।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
facebook
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
শুভ জন্মদিন যাদুকর!
---------------------------------------------------------
ভাঙে কতক হারায় কতক যা আছে মোর দামী
এমনি করে একে একে সর্বস্বান্ত আমি।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
গল্পে আমি দিব্যি ছিলাম
গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-শীত
আমার গল্প সঙ্গে নিয়ে
চলে গেলেন সত্যজিৎ!
বাহ দারুন !
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
(মোম)
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
আজকে গুগল ডুডল ছিল এইটা।
https://www.google.co.in/logos/2013/satyajit_rays_92nd_birthday-1442005-hp.jpg
-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'
হ্যাঁ, কালকে রাতে এটা দেখেই লেখাটা লিখতে বসেছিলাম।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
এটা google.co.in এর বাইরে দেখা যাচ্ছে?
-----------------------------------------------------
"চিলেকোঠার দরজা ভাঙা, পাল্লা উধাও
রোদ ঢুকেছে চোরের মত, গঞ্জনা দাও'
না, আমি এই এড্রেস এই দেখেছি।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
সত্যজিতের স্ত্রীর লেখা স্মৃতিকথাটা পড়ে দেইখেন। সত্যজিতের একটা অতি ঘনিষ্ট চিত্র পাবেন। অসাধারণ একটা বই - ভাল লাগবে।
****************************************
অসংখ্য ধন্যবাদ মন মাঝি। বইটা মনে রাখলাম।
----------------------------------------------------------------------------------------------
"একদিন ভোর হবেই"
নতুন মন্তব্য করুন