নীড়পাতা | সন্দেশ | লিংকস | আড্ডাঘর

Primary Links:

অনলাইনে যারা

সদস্য ১৬ | অতিথি ৬৮
অনলাইনে সর্বাধিক সদস্য ২৪৫, সময় মঙ্গল, ২০০৮-০৭-১৫ ১৭:০৯

শেখ জলিল এর ছবি
১৮ | শেখ জলিল | মঙ্গল, ২০০৮-০৫-০৬ ১৯:৫৪

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ/ শেখ জলিল

প্রথমেই বলতে হয় আমি ছন্দ বিশারদ নই কিংবা বাংলার ছাত্রও ছিলাম না। কবিতা লিখতে গিয়ে যতটুকু শিখেছি, তার বেশি জানি না। হাতের কাছে তেমন বইও নেই যা পড়েছিলাম আগে। সেই যে মাহবুবুল আলম-এর বাংলা ছন্দের রূপরেখা, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের-এর আধুনিক কবিতার ছন্দ কিংবা কবি আব্দুল কাদির-এর ছন্দ সমীক্ষণ কোনো বই-ই নেই এখন আমার কাছে। তাই ভুল হলে প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ মূলত তিনটি- স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত। আবহমানকাল ধরে এই তিন ছন্দেই ছড়া, কবিতা, গান বা গীতিনাট্য লেখা হয়ে আসছে। ছন্দ বুঝতে হলে সিলেবল বা ধ্বনির সাথে আগে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলা ধ্বনিকে মোটা ভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় ।

১. একক ধ্বনি :
যে ধ্বনিতে শুধু একটি মাত্র একক স্বরধ্বনি থাকে । ব্যঞ্জনধ্বনি থাকতে পারে তবে তা শেষে থাকে না । স্বরান্তধ্বনি নানাবিধ হতে পারে :
১.১ যেকোনোএকক স্বরবর্ণ। যেমন: অ , আ , ই , ঈ , উ , ঊ , ও , এ

১.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবণ ।
যেমন: থ (থ্ + অ) , চ (চ্ +অ) , কি (ক্ + ই) , কে (ক্ + এ) , ছি (ছ্ + ই) , সু (স্ + উ) ,

১.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবণ ।
যেমন : ক্ষ (ক্ + ষ্ + অ ) , হ্মী(হ্ + ম্ + , ব্লু (ব্ + ল্ + উ , প্রী (প্ + র্ + ঈ)

১.৪ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবর্ণ । যেমন: স্ক্রু (স্ + ক্ + র্ + উ) , ন্দ্র (ন্ + দ্ + র্ + অ)

২. যুগ্মধ্বনি :
যে ধ্বনিতে যুগ্ম স্বর এককভাবে বা ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় থাকে । যুগ্মধ্বনিও নানারকমের হতে পারে ।

২.১ যুগ্ম স্বরধ্বনি । যেমন : ঔ (ও + উ) , ঐ (ও + ই)

২.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + যুগ্ম স্বরধ্বনি । যেমন : বৌ (ব্ + ও + উ) , সৈ (স্ + ও + ই)

২.৩ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + যুগ্ম স্বরধ্বনি । প্রৌ (প্ + র্ + ও + উ )

৩. হসন্তধ্বনি : যে ধ্বনির শেষে হল চিহ্ন বা হসন্ত চিহ্ন থাকে । এই ধ্বনি উচ্চারনগতভাবে দীর্ঘও গঠনগতভাবে জটিল হয় । একক স্বরধ্বনি , যুগ্ম স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি - সবকিছুই থাকতে পারে । তবে শর্ত একটাই , শেষে হসন্ত( ্ ) ধ্বনি থাকতে হবে ।
যেমন: কাক (ক্ + আ + ক্) , টাক (ট্ + আ + ক্ ), প্রাক্ (প্ + র্ + আ + ক্ ), ক্রৌন্ (ক্ + র্ + ও + উ + ন্ ), স্ত্রৈন্ (স্ + ত্ + র্ + ও + ই + ন্ )

স্বরবৃত্ত : একক , যুগ্ম ও হসন্ত এই তিনটি ধ্বনিই এক (১) মাত্রা ।
মাত্রাবৃত্ত : একক ধ্বনি এক (১) মাত্রা । যুগ্ম ও হসন্ত ধ্বনি সবসময়েই দুই (২) মাত্রা ।
অক্ষরবৃত্ত : একক ধ্বনি সবসময়েই এক (১) মাত্রা । যুগ্ম ও হসন্ত ধ্বনি শব্দের শুরুতে বা মধ্যে বসলে এক (১) মাত্রা আর শব্দের শেষে বসলে দুই (২) মাত্রা ।

স্বরবৃত্ত বা লৌকিক ছন্দ এসেছে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। এই ছন্দ নাকি মানুষের ভেতর আপনাআপনি খেলে। তাইতো খনার বচন, আদি ছড়া এই ছন্দে সমৃদ্ধ। শ্বাসাঘাত বা একবারে উচ্চারিত অংশই এর একক মাত্রা। একটি ছড়ার লাইন দিয়ে একে বোঝানো যেতে পারে-

আয় ছেলেরা/ আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে/ যাই
১+৩/১+৩/১+৩/১
ফুলের মালা/ গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি/ যাই
২+২/২+২/২+২/১
এখানে শ্বাসাঘাত বা একবারে যাতোটুকু উচ্চারিত হয়েছে তাতোটুকুকে একমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
৪/৪/৪/১
৪/৪/৪/১
অথবা আর একটি ছড়া-
ঐ দেখা যায় তাল গাছ
১+২+১/১+২ (ব্যতিক্রম-এখানে গাছ-কে ২ মাত্রা ধরা হয়েছে)
ঐ আমাদের গাঁ
১+৩/১
ঐ খানেতে বাস করে
১+৩/১+২
কানা বগীর ছা
২+২/১
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
৪/৩, ৪/১, ৪/৩, ৪/১......এভাবেই চলে আসছে কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দের খেলা।
এবার আসি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কথায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলো একটু টেনে টেনে পড়লেই ছন্দটা কানে বাজে বেশি। যারা গান করেন তাদের বুঝতে সুবিধা হবে- স্বরবৃত্ত যদি চলে কাহারবা বা ঝুমুর তালে তবে মাত্রাবৃত্ত চলবে দাদরা বা তেওড়া তালে। বেশ আগে থেকেই কবিরা এ ছন্দে কবিতা লিখে আসছেন। আধুনিক অনেক ছড়াকাররাও এ ছন্দ নিয়ে বেশ খেলছেন।

সন্ধি বিচ্ছেদে যেমন শব্দকে ভাঙতে হয়, তেমনি এ ছন্দেও শব্দকে ভেঙ্গে মাত্রার একক নির্ণয় করতে হয়। যারা স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি বোঝেন তাদের জন্য এ ছন্দ বুঝতে সুবিধা হবে। যেমন- সন্ধান=সন্+ধান=২+২=৪ মাত্রা, অভিধান=অ+ভি+ধান=১+১+২=৪ মাত্রা বা মৃত্যু=মৃত্+তু=২+১=৩ মাত্রা, শৈত্য=শৈত্+ত=২+১=৩ মাত্রা অথবা ল=লক্+খ=২+১=৩ মাত্রা,
আব= আ+বক্+খ=১+২+১=৪ মাত্রা বা কবিতা=ক+বি+তা=১+১+১=৩ মাত্রা, সুচরিতা=সু+চ+রি+তা=১+১+১+১=৪ মাত্রা। অর্থাৎ সংযুক্ত বর্ণের সংযোগ অংশের একবারে উচ্চারিত অংশ বা ধ্বনিকে সব সময় ২ মাত্রা ধরা হয়। যেমন একটি কবিতায়-

এইখানে-- তোর/ দাদীর --কবর
২+১+১--২/ ১+২--১+২=৬+৬
ডালিম --গাছের/ তলে
১+২--১+২/ ১+১=৬+২
তিরিশ বছর/ ভিজায়ে-- রেখেছি
১+২--১+২/ ১+১+১--১+১+১=৬+৬
দুই --নয়নের/ জলে
২--১+১+২/ ১+১=৬+২
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--৬+৬, ৬+২, ৬+৬, ৬+২।

অথবা আর একটি কবিতায়-
আমাদের/ ছোট নদী/ চলে বাঁকে/ বাঁকে
১+১+২/১+১--১+১/১+১--১+১/১+১=৪+৪+৪+২
বৈশাখ/ মাসে তার/ হাঁটু জল/ থাকে
২+২/১+১--২/১+১--২/১+১=৪+৪+৪+২
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--৪+৪+৪+২, ৪+৪+৪+২।

ছন্দের যাদুকর নামে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কেমন করে স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত নিয়ে খেলেছেন, এমনকি একই কবিতায় দুই ছন্দের ব্যবহারও করেছেন- সে গল্প পরের লেখায় বলার ইচ্ছে রইলো।

আমাদের তৃতীয় প্রাথমিক ছন্দ হলো অক্ষরবৃত্ত। এই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে আধুনিক কবিরা সবচেয়ে বেশি খেলায় মেতেছেন আজকাল। পয়ার থেকে চতুর্দশপদী, অমিত্রাক্ষর, মুক্তক, গদ্যছন্দ কতভাবেই না এই ছন্দ ভাঙছেন তাঁরা কবিতায়- তার ইয়ত্তা নেই। তবে বোঝার দিক দিয়ে এই ছন্দ সবচেয়ে সোজা। শুধুমাত্র অক্ষর গুণে গুণে এই ছন্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। একক অক্ষর বা সংযুক্ত অক্ষরকে ১ মাত্রা ধরা হয়। তবে কখনো কখনো সংযুক্ত অক্ষরকে ২ মাত্রাও ধরা হয়। সেটা নির্ভর করবে কবির লেখার বানান-রীতির উপর। আরও একটি সহজ নিয়ম হলো হসন্ত বর্ণ স্বরবৃত্তে ১ মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে শব্দের প্রথমে বা মাঝখানে ১ মাত্রা কিন্তু শেষে ২ মাত্রা হবে। এবার আসা যাক ছন্দ বিশ্লেষণে। পয়ার চর্চার যুগে পুঁথি সাহিত্যের একটি কবিতায়-

১.
লাখে লাখে সৈন্য মরে/ কাতারে কাতার
২+২+২+২/ ৩+৩
শুমার করিয়া দেখে/ চল্লিশ হাজার
৩+৩+২/ ৩+৩ অথবা

২.
ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ/ হাঁটিয়া চলিল
৩+৩+২/ ৩+৩
কিছুদূর গিয়া মর্দ/ রওনা হইল
৪+২+২/ ৩+৩
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম-
প্রথমটির ৮/৬, ৮/৬ এবং দ্বিতীয়টিরও ৮/৬, ৮/৬

কিংবা মুক্তক ছন্দে রচিত জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়-
অর্থ নয়, কীর্তি নয়,/ সচছ্লতা নয়-
২+২+২+২/ ৪+২
আরো / এক বিপন্ন বিস্ময়
২/ ২+৩+৩
আমাদের অন্তর্গত / রক্তের ভিতরে
৪+৪/ ৩+৩
খেলা করে
২+২
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম- ৮/৬, ২/৮, ৮/৬, ৪

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে কবিতাগুলোতো একটা অষ্টক রীতি বা ৮ মাত্রা মিলানোর প্রচেষ্টা রয়েছে সর্বদা। এটাই হলো পয়ারের রীতি। আর হ্যাঁ, যেখানে ৮ মাত্রা মেলেনি সেখানে কিন্তু জোড় মাত্রা মেলাতে হবে, বিজোড় নয় কখনো। এটাই হলো অক্ষরবৃত্তের প্রাথমিক নিয়ম।


জবাব

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ফায়ারফক্সান » কেন?

লগইন করুন