ওয়েলসে একটা সংস্থা আছে যার নাম বাউসো (BAWSO) অর্থাৎ কিনা Black Association of Women Step Out. সংখ্যালঘু কৃষ্ণবর্ণ আর প্রায়কৃষ্ণবর্ণ মেয়েদের নিয়েই এরা কাজ শুরু করে। কিন্তু এখন শ্বেতাঙ্গরাও সাহায্য পায় এখানে। দিন পেরিয়ে এখন বাউসো অনেক বড় হয়েছে। বেড়েছে কাজের পরিধিও।
কাজের সুত্রে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল কেনিয়ার রানজিকোর সাথে মাস কয়েক আগে। সেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বাউসোর অফিসে। সেখানে গিয়ে পরিচয় হল সুদানের অ্যাগনেস এর সাথে। এক ঢাল ঝাকড়া চুলের মাঝে অদ্ভুত দুটো চোখ। এটুকুই চোখে পড়ে সবার আগে। হরিণ ভয় পেলে মনে হয় এমন করেই তাকায়। অনেক অভিমান আর অভিযোগ চোখ দুটিতে।বয়স কতই বা হবে। জিজ্ঞেস করতেই ভাঙা উচ্চারনের ইংরেজীতে বলল এই জুলাইতে ১৩ হবে। কোলের বাচ্চাটা দেখে চমকে গেলাম আমি। কে জানতে চাইলে ভয়ার্ত চোখ দুটো কেমন যেন সাহসী হয়ে উঠল। হাসিমুখে জানাল সে শিশুটি তাঁরই মেয়ে মরগ্যান। আরও জানলাম তাঁর শ্বেতাঙ্গ বন্ধুর কীর্তিকলাপ। তার বিশদ বর্ণনায় নাই বা গেলাম। গর্ভে শিশুটিকে নিয়ে সৎ বাপের তাড়া খেয়ে ঠাই পেয়েছে সে বাউসোর আশ্রয় কেন্দ্রে। আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। অ্যাগনেস এর এখন নিজেরই বাড়ন্ত বয়স! ভেবে কুলকিনারা পেলাম না এদের মত উন্নত সমাজব্যবস্থার মধ্যে এত বড় ফুঁটো কেমন করে হয়। মরগ্যানের সাথে আমার ভাব হয়ে গেল খুব। কি যে সুন্দর বাচ্চাটা! আমি বাচ্চা ভালবাসি খুব। রানজিকোর সুত্রে আরও অনেক ছোটছোট মায়ের সাথে দেখা হয়েছে এইকয়দিনে। অনেক কথা হয়েছে। সাদা, কালো এমনকি ভারতীয়ও আছে। এদের মধ্যে যারা ওয়েলশ বা ইংরেজ নয়, তাদের অনেকেই ইংরেজী ভাল পারেনা। স্কুল ছেড়েছে বেশির ভাগ। এমনকী ঘরও। এত সভ্য দেশের এই অসভ্য আদিম রুপটা আসলেই খুব ভয়াবহ। এদের অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে কিশোরী মায়ের সংখ্যা এত বেশী যে কল্পনা করা যায় না। কাউন্সিলের স্কুল গুলোতে নিজস্ব নার্সারী আছে অনেক জায়গাতে যাতে কিশোরী মায়েরা স্কুলে আসে। তবু লাভ হয়না। সবচেয়ে ভয়ংকর হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই বাচ্চাগুলোর বাবাদের দেখলে মনেহয় খেলার মাঠ থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।
বাউসোর সাথে কাজ করা শুরু করার পর থেকে এদের ভঙ্গুর সমাজ ব্যবস্থার আসল চিত্রটা খুব কাছে থেকে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের দেশেও তো গ্রামে গ্রামে ছোট ছোট মাগুলো কত কষ্টই না করে! তাঁদের কতজন বেঁচে থাকে কতদিন কেউকি খবর রাখি আমরা? সেই নিরিখে আমি জানি এই ভিনদেশী কিশোরী মাদের জন্য এত মায়া আদিখ্যেতা দেখায় হয়ত। আর এদের নিজেদের দোষ এখানে অনেকখানি। কিন্ত তবু খুব মায়া লাগে। খুব মন কেমন করে তাঁদের কোলের ফুটফুটে নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর জন্য। আমি এখনো মা হইনি। তবু শিহরিত লাগে শিশুর স্পর্শে। আর মা গুলোও তো একদম বাচ্চা! এরা কিছু করে না কেন এই পরিস্থিতি বদলাতে? আমি ভাবতে গিয়ে অবাক হয়ে যাই! এর নাম নাকি উন্নত দেশ আর সভ্যতার উৎকর্ষ।
রানজিকো কালকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল আমি অ্যাগনেস আর ওর মত আরো দশ পনেরোজন কে ইংরেজী আর বেসিক আইটি শিখাতে পারব কিনা। আমার অর্ধাঙ্গ বেশ রুষ্ট হয়েছেন আমি রাজী হওয়াতে। একটু সময় বের করে নিতে পারব আমি নিশ্চয়ই।কি করব। কেন জানি না খুব মায়া লাগে বাচ্চা কোলে ছোট ছোট মাগুলোকে দেখলে। খুব মন থেকে প্রার্থনা করি যেন এইভাবে ছোট ছোট মেয়েগুলোর জীবন স্থবির না হয়ে যায়।
মন্তব্য
আপনার সদুদ্দেশ্য সার্থক হোক। Good on you.
"পরিসংখ্যানে মাপে জীবনের ক্ষয় ক্ষতি।" পশ্চিমা দেশগুলোতে শিশুর খুবই দরকার, তা যেভাবেই জন্ম নিক।
আপনার নির্ভয় পদক্ষেপের জন্যে অবিনন্দন!
আপনার অর্ধাঙ্গের রুষ্টতা আশা করি থাকবেনা, সে কামনা করি।
**********************************
কৌনিক দুরত্ব মাপে পৌরাণিক ঘোড়া!
**********************************
যাহা বলিব, সত্য বলিব
ছোট ছোট মায়েদের কথা ভেবে কষ্ট লাগছে।
আমিও প্রার্থনা করি, তাদের জীবন গতিশীল করার জন্য আপনার যথাসাধ্য প্রচেষ্টা যেন সফল হয়।
...........................
সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন
...........................
একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে আমার এমন কাঙালপনা
গুড লাক
শুভ কামনা...
---------------------------------
টিনএজারদের মা হওয়ার প্রবণতা এখন হু হু করছে বাড়ছে উন্নত(!) দেশগুলোতে। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখিও হচ্ছে, সিনেমাও হচ্ছে। পশ্চিমে শুনি এখনকার মা'রা তাদের টিনএজ মেয়েদেরকে লুকিয়ে লুকিয়ে (খাবারের সাথে বা অন্যভাবে যেভাবে বাচ্চাদের অসুধ খাওয়ানো হয় আমাদের দেশে) পিল খাওয়ায়।
আর এখানেই সামনে চলে আসছে স্কুলে যৌনশিক্ষার অন্তর্ভূক্তি নন্তর্ভূক্তি বিষয়টা। আমাদের দেশেও এখন এই বিষয়টা উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। উঁকি বড় না ঝুঁকি বড় সেটাই এখন প্রশ্ন।
আপনার সদুদ্দেশ্য সফল হউক।
ধন্যবাদ
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল
আমি সব সময়েই আপনার ভক্ত। আজকে ভক্তি আরও একটু বেড়ে গেলো।
অনেক অনেক শুভ কামনা আপনার আর আপনার ছাত্রীদের জন্য।
উদ্দেশ্য সত্ হলে কোনো বাধাই আর থকে না শেষ পর্যন্ত।
আপনার ইচ্ছেটা সফল হোক। (অনেকদিন হলো আপনার নতুন লেখা পাই না!)
যতবার তাকে পাই মৃত্যুর শীতল ঢেউ এসে থামে বুকে
আমার জীবন নিয়ে সে থাকে আনন্দ ও স্পর্শের সুখে!
নতুন মন্তব্য করুন