"This scene, like my own life," I said, "is one
Where many glooms abide;
Toned by its fortune to a deadly dun--
Lightless on every side."
- Thomas Hardy
নীল কোরাগেটেড প্লাস্টিকের ছাদে বৃষ্টির ছাঁট আর বিকেলের মিইয়ে যাওয়া আলোর নকশাটা অদ্ভূত লাগছিল দেখতে। অনি পানিতে চিত হয়ে ভাসতে ভাসতে দেখছিল ছাদের দিকে। আজকের এই ঝুম বর্ষার বিকেলে কেউ আসে নাই সুইমিং-এর জন্যে। হয়ত ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে একটা অলস বিকেল, বা চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসেছে সবার সাথে বৃষ্টির বিকেলের জমাটি আড্ডায়।
ফারাজের কথা মনে পড়ে এমন সব দিনে। কথা হয় না অনেকদিন... বলবার তেমন কিছু নেই আসলে, বলতে গেলে ভুল বুঝবার সম্ভাবনা বেশি। মাস দুয়েক আগের ১৯শের সকাল থেকেই অনির মনে ছিল কালকে ২০, ফারাজের জন্মদিন। মোবাইলে অনেক অনেকদিন আগে সেট করা বাৎসরিক অর্গানাইজার তাও রাত ১২টায় অ্যালার্ম বাজিয়ে মনে করাল, ‘বন্ধু্কে শুভেচ্ছা জানাবেনা’? অনি সেদিন সারাটা দিন ব্যস্ত ছিল নিজের নানান কর্মকান্ডে, অথচ একবারের জন্যেও ফরাজের মুখটা ভুলতে পারে নাই। রাতে অনলাইন হয়ে ফেসবুকের ওয়ালে খুব ছোট বার্তা রেখেছিল – “শুভ জন্মদিন”। আর মনে মনে বলেছিল - ভাল থাকিস। জানা ছিল পরের মাসে অনির জন্মদিন মনে রাখবে না কেউ একজন, ফেসবুক, ফোন, কোথাও আসবে না ছোট মেসেজটুকু। ‘আশ্চর্য্য, এতে অবাক হবার কী আছে!’ ভাবে অনি। আর আজকে সে কথা মনে পড়ারই বা কী আছে? দূরত্ব সৃষ্টির শুরুটা ছিল চিন্তাভাবনার ফারাক থেকে, অথচ আইডিওলজিতে অমিলতো ছিল না, ছিল যোগাযোগের অভাব, হালকা ঠাট্টাকে সহজভাবে নিতে না পারার ফারাজের অক্ষমতা, আর অনির নিজের একগুঁয়ে জেদ। বন্ধু হিসেবে বন্ধুকে চেনার প্রয়োজন আছে, ভাবার দরকার আছে ঠিক কোন জিনিসটা অপছন্দ করছে অন্যজন, ভাবে অনি। একবার দু’বার বলে দেয়া যায়, মানা করা, অনুরোধ করা যায়, তারপরে আর নয়। আর বারবার বন্ধুত্বের প্রমাণ দিতেও রাজি নয় সে। ফারাজ বন্ধুত্বের সংজ্ঞা ভুলে যেতে পারে অনায়াসে, অনি জানে সে নিজে কখনোই ফারাজের কাছ থেকে দূরে নেই। দূর পরবাসেও ওর প্রতিটা সাফল্যে মন থেকে খুশি হয় অনি, মন থেকে ভাল চায় বন্ধুর। অনির আজও মনে পড়ে কখন কবে ছোট কোন কাজেও ফারাজ এগিয়ে এসেছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। বন্ধুর গুণের প্রশংসা করে অকপটে অনি। নিজেকে মনে করিয়ে দেয় বন্ধুত্ব নিঃস্বার্থ হতে হয়, তবুও নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে ভাবে, ফারাজ কি কোনদিন জানবে তার যেকোন দরকারে অনিও যে কোন মুহূর্তে হাজির হতে পারে পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে, এখনো?
রাগ লাগে ওর। পানির মাঝে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ও, পুলের অগভীর দিকের দেয়ালে ডান পা ঠেকিয়ে কিক করে, ডুবসাঁতারে মাঝ বরাবর চলে এসে ভুস করে ভেসে ওঠে। আরেকটু হলেই ধাক্কা খাচ্ছিল একটা বছর দশেকের বিচ্ছু বাচ্চার সাথে। এর এখন পানিতে থাকার কথা ছিল না। আজকে বৃষ্টির দিনে দেরী করে এসেছে, আর অন্য কেউ না থাকায় গার্জেনের অনুরোধে সুইমিং ইন্সট্রাক্টর ওকে অন্যদের টাইমেও পানিতে থাকতে অনুমতি দিয়েছে। প্রথমেই আপত্তি জানিয়েছিল অনি। কিন্তু প্রশিক্ষক বললেন – “এইতো আর কুড়ি মিনিট থাকুক। আপনাদের ব্যাচের তো কেউ আসে নাই আজকে, পুলতো ফাঁকাই।“
বিতর্কে যাবার মেজাজ ছিল না। সাঁতার শিখে গেছে বাচ্চাটা, এবং সেই সাথেই সমবয়সী অন্য সাঁতারুদেরকে বিরক্ত করার প্রায় সবরকম কৌশল। আজকে ফাঁকা পুল পেয়ে শুরু থেকেই ঝামেলা করছে, পুরো পুল জুড়ে দাপাদাপি, চারিদিকে পানি ছেটান, আওয়াজে মাথা খারাপ। ওদিকে অভিভাবক আর প্রশিক্ষক মিলে মহা সাংসারিক সুখ-দুঃখের গল্প জুড়েছেন পশ্চিমের দেয়াল জুড়ে রাখা সাদা প্লাস্টিকের গার্ডেন টেবিলগুলির একটার এক জোড়া চেয়ার দখল করে। যেদিন অনেকেই আসে, ছোট্ট পুলটা ভীড় হয়ে থাকে, অনিচ্ছাতেও পরিচয় হয়ে যাওয়া দু’একটি পরিচিত মুখ, কুশল আদান-প্রদান, স্মিত হাসির ছোঁয়া, বা ওদের ঠিক আগের ব্যাচে কেবল শিখছে যে বাচ্চাগুলি তাদের হইচই, ভালই লাগে চুপচাপ দেখতে।
জায়গাটা ছোট, ছোট একটা ৩০'-১৫' এর পুল, তার একপাশে বসবার জন্যে চারটা প্লাস্টিকের গার্ডেন টেবিল প্রতিটার সাথে দু’জোড়া চেয়ার। ওয়ালে ফ্যান মাউন্ট করা আছে গরমের দিনের জন্যে। পুলের অন্য মাথায় আছে পাশাপাশি ৪টা শাওয়ার রুম। কাপড় বা জিনিস রাখবার আলাদা লকার নেই। ছোট শহরের অল্প কিছু সুইমিং ফ্যাসিলিটির এইটা অন্যতম। দিনের মাঝে ছেলে-মেয়ে-বড়-ছোট মিলিয়ে ৫টা ব্যাচ, ঘন্টা দুয়েকের জন্যে একেকটা শিডিউল, গরমের দিনে বেশ রমরমা হয়ে থাকে। সামনে একটা ছোট্ট অফিসঘর আছে। পুল আর অফিসের মাঝে একটা ছোট ঘরকে করে দেয়া হয়েছে জীম, সাঁতারুদের ওয়ার্ম-আপ, স্ট্রেচিং-এর জন্যে।
অনেক কষ্টে নিজের গতি কমিয়ে বাচ্চাটাকে আঘাত করে ফেলা থেকে থামতে হয় অনিকে। বাচ্চাটা দাঁত কেলিয়ে হোহো করে হেসে ওঠে। অনি টের পায় ইচ্ছে করেই এমন করছে এই বাঁদরটা, কিছু কিছু বাবা-মা যে নিজেদের ছেলেমেয়েকে এমন মাথায় তুলে রাখতে পারে, কোন রকম শাসন ছাড়া!
এবার বেশ বিরক্ত হয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশিক্ষকের, “আমার মনে হয় কুড়ি মিনিট পার হয়ে গেছে অনেক আগেই, এবার ওর ওঠা উচিত, ঠান্ডা লেগে যাবে নইলে”। বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বলে। প্রশিক্ষক আর অভিভাবক দেয়ালে ঝোলান বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আর আপত্তি জানাবার সু্যোগ পান না। আসলেই বিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে বেশ অনেক্ষণ। বাচ্চাকে উঠিয়ে রেডি করে বেরিয়ে যেতে আরো মিনিট পনের খরচ হয়। প্রশিক্ষক ওদেরকে নিয়ে বেরিয়ে যান ঘষা কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা ঠেলে।
পুলটা অনির একার হয়ে যায় এবার। অলসভাবে পানিতে ভাসে অনি। তাকায় পূবদিকের দেয়ালে। দুপুরের ঝুম বৃষ্টিটা নেই আর। বরং আলো ফুটেছে পশ্চিমের মেঘ সরে গিয়ে। নীল চাল আর দেয়ালের মাঝে একটা বিঘৎখানেকের ফাঁক আছে, সেখান দিয়ে পশ্চিমের তীব্র কমলা আলোর একটা মোটা বীম তৈরি হয়েছে পূবের দেয়ালে।তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষা ইপিল ইপিল গাছের পাতারা কেমন হিবিজিবি ছায়ার নকশা তৈরি করে।
অনির আজ না আসলেও চলত, কিন্তু এই সময়টুকু ভাল লাগে অনির। গরমের রোদেলা গুমোট বিকেলবেলাগুলি আরাম করে পার করে দেয়া যায় ঠান্ডা জলে। পানিতে নামলে নিজেকে খুব হালকা লাগে, মাঝে মাঝে মনে হয় মাথাটাও হালকা হয়ে গিয়েছে। সাধারণত অন্যদের দিকে বিশেষ মনযোগ দেয় না অনি। পুলে নেমে বিশ-পঁচিশ বার পুলের এমাথা-ওমাথা একটানা সাঁতার কেটে জুড়োবার জন্যে চিত হয়ে ভাসতে শুরু করে ছাতের দিকে মুখ করে। ছাদটা ভাল লাগে ওর। নীল প্লাস্টিকের শীট দিয়ে ঢাকা চার-চালা একটা। মজা লাগে রোদের দিনে পড়ন্ত বিকেলে আলো হয়ে থাকা ভেতরটা, দেয়ালগুলোও নীল হয়ে যায় কেমন যেন। এ সময়টা অনেক বেশি সতেজ লাগে নিজেকে। মনে হয় মগজের জটগুলি খুলে যাচ্ছে এক এক করে। ভাসতে ভাসতে যেমন ও কখনো ভেবেছে ননলিনিয়ার ডিজিটাল মডুলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে আঁকা পাওয়ার স্পেক্ট্রাল ডেন্সিটি প্লট নিয়ে, তেমনি মাথায় ঘুরেছে দিনান্তের অনেক এলো চিন্তা।
গত মাস থেকেই মিঠুর কোন খোঁজ নেই। মানে অনলাইন অ্যাক্টিভিটি নেই কোন। এখন সবার জীবন এমন যান্ত্রিক ব্যাস্ততায় ঘেরা যে ভাই-বোন থেকে বন্ধুরা সবার সাথেই যোগাযোগ রাখা চলে আইএম আর সোশাল নেটওয়ার্কে। মন্দ নয় ব্যাপারটা, এমনিতেও সবাই যার যার প্রয়োজনে বাড়িতেই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অফিসে পিসি অন করেই রাখে। ফেসবুক/টুইটারে জানা যায় নিত্য আপডেট, যারা বেশ মিয়মিত এ ব্যাপারে আর কি, যারা মেসেজিং-এর ধার ধারে না, তাদেরকেও মেইলে পাওয়া যায় জরুরি দরকারে। দেখা না হোক, যোগাযোগতো আছে.... এটাইতো নিয়ম, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা।
মিঠুর ব্যাপারটা বোঝে না যদিও অনি। মেয়েটা যখন নিয়মিত অনলাইন থাকে, এটা ওটা পোস্ট করে, মেইল করে, মজার সব মন্তব্য আর হইচই করে মাতিয়ে রাখে বন্ধুদের বিমূর্ত জগৎ। আর মাঝে মাঝে একদম গুম মেরে যায়। অনি ভাবে ওর ব্যাক্তিগত জীবনটা কি খুব এলোমেলো? হয়ত সেটা আড়ালে রাখতে চায় মিঠু, তাই হারিয়ে যায় মাঝে মাঝে। বা হয়ত ওর কাজ ওকে বাধ্য করে মাঝে মাঝে লাপাত্তা হয়ে থাকতে, হয়ত নেট কানেকশন থাকে না বা সবসময়, বা থাকলেও সময় পায় না ফালতু কাজে নষ্ট করার। রুমি ব্যাপারটা নিয়ে হতাশ হয় মাঝে মাঝেই। পুরনো বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে জানতে চায়, তার কাছ থেকেও লুকিয়ে থাকার অযুহাতটা কী? অনি বোঝে রুমির অনুযোগ। ওর গোমড়া মুখ দেখেই বুঝে নেয় আজ নিয়ে ঐ চাপা স্বভাবের বন্ধুটির মন উদাস থাকতে পারে।
রুমি নাকি অনলাইন থাকেই শুধু মিঠুর জন্যে। তাই অনেক সময় মিঠু অফ থাকলে রুমিকেও খুঁজে পেতে যন্ত্রণা পোহাতে হয় বন্ধুদেরকে। মিঠু আর রুমি কত পুরনো আর কাছের বন্ধু! ওদের আপডেট না জানলে অনেক মিস করে সে নিজেও, চিন্তা হয়। ভাবে, কে জানে কেমন আছে, কী করছে। কত গল্প শেয়ার করা হচ্ছে না পাজি দুটার সাথে। অমুক কথাটা শুনলে কী বলত ভেবে নেয় অনি, নিজের অজান্তেই হেসে ফেলে। কিন্তু মিঠুর খোঁজ না পেলেও রুমির মত অস্থির হয় না। বুঝতে পারে ওর নিজের জন্যে মিঠু স্রেফ এই পৃথিবীতেই কোথাও আছে, ভাল আছে এই জানাটুকুই অনেক। কাওকে জোর করে বেঁধে রাখা যায় না, সেটা জানে অনি, নিয়ম-নীতি, ভালবাসা, বন্ধুত্ব, কিছু দিয়েই। At the end of the day every man IS his own island!
গোধূলির সাথে সাথে পশ্চিমের রঙ গাঢ় লাল হয়। এক সময় আকাশের কমলা আর লালে, গাঢ় হয়ে যাওয়া নীলের আবছায়া অন্ধকার গুটিশুটি মেরে এগিয়ে আসতে থাকলেও আজকে ডিউটিরত ইন্সট্রাক্টর বা অফিসের কেউ আলো জ্বালিয়ে দিতে আসে না। অনির ওদেরকে ডাকতে ইচ্ছে করে না। অন্ধকার হতে থাকে অনির ভেতরটাও।
অনির সাথে এই সময়টায় সাঁতার কাটে সাধারণত কিছু ১৮-১৯ বছরের হবু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, মানে অ্যাডমিশনের অপেক্ষায় আছে ওরা, আর সেই ফাঁকে গরমের দিনে একসাথে ঘন্টা খানেক রিল্যাক্স করা, গল্পগুজব আড্ডাবাজি। বেশ জলি ওরা ক’জন। অনি এই সময়টুকু একা একা নিজের মনে থাকতে চাইলেও কেমন করে যেন ওদের মাঝে তিনজনার সাথে বেশ ভাল আলাপ হয়ে গেছে ওর। আলাপে বুঝেছে বেশ ভাল স্টুডেন্ট। আজকে বৃষ্টি দেখেই মনে হয় সবাই মিলে কিছু একটা প্ল্যান করেছে, আসেনি কেউই। ওদের মজার ফাঁকে ফাঁকেই উচ্চ-শিক্ষার দপ্তরে জীবনের প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ওদের চাপা উত্তেজনাটা মাঝে মাঝে টের পায় অনি। নিজের এই বয়সটার কথা মনে পড়ে। আর সেই সাথে শিমুলের কথা।
গেল মাসে শিমুলকে অনলাইনে পেয়ে আলাপ হচ্ছিল।‘দেখাই পাওয়া যায় না’ মন্তব্য করতেই শিমুল জানায় তার রিসার্চের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়ে যাবে আর কিছুদিনের মাঝেই, খুব ভাল আরেকটা স্কলারশিপ পাবার জোর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তার ধারণা অনেক সময় নষ্ট করছে সে অকারণে, কাজে মন দেয়া দরকার আরো। অনি মনে মনে মুচকি হাসে আর প্রকাশ্যে সায় দেয়। শিমুল সেই ছেলেবেলা থেকেই মহা পড়ুয়া। কখনো নিখাদ ছুটির সময় না হলে বন্ধুদের সমাবেশেও ওকে আড্ডাবাজিতে আনা যেত না, কি স্কুলে কি পরে। অনি মজা পায় চিরকাল ওর এই চারপাশের সবকিছুকে স্পেস আউট করে দেয়ার ক্ষমতাটাকে। মাঝে মাঝে শিমুলের এই সামর্থ্যটাকে সামাণ্য হিংসা হয় ওর।
রবার্ট মাইলসের 'ফেবলস'-এর আওয়াজে চমক ভাঙে অনির। ফোন বাজছে। হঠাৎ গ্রাস করা হতাশার দৃষ্টি নিয়ে তাকায় দরজার দিক থেকে তিন নম্বর টেবিলের উপরে রাখা নিজের স্বল্প কিছু জিনিসের দিকে। লকার না থাকায় কেউই তেমন কিছু সাথে আনে না। আজকে হঠাৎ ইচ্ছে হতেই হুট করে চলে আসায় ফোনটা সাথে থেকে গিয়েছে।
মা। এই রিংটোনটা ফ্যামিলি গ্রুপে সেট করা আছে।কিন্তু এখন এইটা মা ছাড়া আর কারো ফোন নয়। দু’হাতে মাথাটা ধরে পানির নিচে ডুব দেয় অনি, পানির তলে ঝাপসা শোনায় পছন্দের মিউজিক। আবার বাজে... আবারো… অনি পুলের গভীরতম অংশে সরে যায় ডুব সাঁতারে। দম ফুরিয়ে গেলে ভেসে ওঠে। পালাতে চায় ঐ ফোনটা থেকে।
অনি জানে তার মায়ের শত ব্যাস্ততার মাঝেও এখন ফোন দেবার সময় হয়ে উঠেছে কেন। নিজের কানে অপ্রিয় সত্যটা শুনতে আগ্রহ হারায় অনি। আজকে কত দিন হল একসাথে সবাই খাবার টেবিলে বসেনি রাতে? কাল রাতে শেষ বারের মত বাসায় ফেরেনি বাবা। কিন্তু এত অবশ্যম্ভাবী ছিল।
তাকে যত্ন নিয়েই মানুষ করেছেন বাবা-মা। আর সেও যোগ্য সন্তান। লেখা-পড়া, খেলা-ধূলায় টপে থেকেছে স্কুল থেকেই। বাবা-মার নাম রেখেছে সবচেয়ে নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে, একের পর এক ভাল ফল করে দেখিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের জগতে ঢুকে যাবার পর থেকেই কি ফাটলটা তীব্রতর হয়েছে তবে? নিজেকে দোষারোপের কিছু নেই এখানে তা জানে অনি। কিন্তু তবুও সন্তান হিসেবে তারই ত্রুটি রয়ে গেছে এই কথাটা কেন বারবার ঘুরে ফিরে আঘাত হানছে তাকে? আগে থেকেই তো যা হবার নয় তাই হবার ছিল, অনি কি এতদিন স্রেফ চোখ বুঁজে ছিল? বাবা-মার আচরণে সেকি বারবার অনুভব করেনি একটা সূক্ষ উদাশীনতা? টের পায়নি যে তার প্রতি তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়েছে সে যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে নিজের একটা অন্য রকম জগৎ গড়ে নিল তখনই? পারিবারিক অসামঞ্জস্যতাগুলি কি চোখে পড়েনি? নিজেও তো ও দেখতে চায়নি, দূরে সরে থেকেছে, বন্ধুদের সাথে ছুটির সময়গুলি হইহুল্লোড় করে কাটিয়েছে, নিজেকে প্রবোধ দিয়েছে সবকিছুই ঠিক আছে বলে। বাড়ির উত্তেজনা টের পেতে দেয়নি অনি বাড়ির বাইরের কাওকেই। নিজের অস্থিরতা আড়াল করেছে হাসি-গানে মেতে থেকে। নিজের কাজের মাঝে ডুবে থেকে।
কিন্তু সত্যি কি শুধু তাই? বাবা-মাও কি এতদিন সবার কাছ থেকে তাদের প্রতিষ্ঠিত জগৎ থেকে এই সত্যকে আড়াল করে রাখতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যান নি? ছোট্ট শহর, সবাই সবাইকে চেনে, বিশেষ করে যদি অনিদের পরিবারের মত সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি পরিবার হয়। আর দু’একদিনের মধ্যেই অনির বন্ধুরা, পরিচিতেরা সবাই জেনে যাবে অনির বাবা-মা ‘দি এলিটস অফ দি সিটি’ আর একসাথে থাকছেন না। এতে কি খুব একটা কিছু যায় আসবে? ভাবার চেষ্টা করে অনি। কিন্তু চোখ জ্বালা করে ওর। এরা পানিটা বদলায়নি নাকি আজকে? বাহ! অলস বৃষ্টির দিন পেয়ে পুলের পানি বদলানোতে আলস্য দেখাবার কোন মানে হয়? কিন্তু চোখ রগড়ে পানিতে স্থির হয়ে তাকিয়ে দেখে অনি, কই? পানি তো ঝকঝক করছে। তবে? তবে কি ওর নিজের চোখ দুটোই বিট্রে করছে ওকে? অপমান লাগছে কি অনির? ভাবছে কী করে মাথা উঁচু করে রাখবে যখন ওর বন্ধুরা ওর আড়ালে ফিসফিস করে কথা বলবে ওকে নিয়ে? ভাবছে কিভাবে ও আবার হইহুল্লোড় করবে সবার মাঝে মিশে গিয়ে? যে অনি সবসময়ে থেকেছে বন্ধুদের শক্তির উৎস হয়ে, সবার মন খারাপের দিনে সবল কাঁধ হয়ে, অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ছোট-ভাইবোন থেকে বয়সে বড় অনেক বন্ধুদেরও, তাদের অনুকম্পা আর করুণা মেশান চোখের দৃষ্টিগুলি ওর মত দৃঢ়চেতা কেউ সহ্য করতে পারবে কী? অনি তো হারিয়ে যেতে পারবে না কোথাও। আশেপাশের আর দূরের চেনা মানুষগুলির সাথে তার বন্ধন ছিন্ন করতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে তারই। শিমুলকে অসম্ভব হিংসে হয় অনির। ইশ! যদি পারত ওর মত আশেপাশের জগতের সাথে নিজের একটা দেয়াল তুলে নিজেকে বিছিন্ন করে ফেলতে মাঝে মাঝেই নিজের প্রয়োজনে! যদি পারত মিঠুর মত ডুব দিতে সময়ে বা অসময়ে!
তার চেয়ে ঐ ফোনটা আজকে না ধরলেই তো হয়! পুলের গভীরতম অংশে সরে যেতে থাকে অনি। মাথা না তুলেও বুঝতে পারে ঝুম বৃষ্টি নামছে আবার। নীল প্লাস্টিকের ঢেউ খেলান ছাদে ভোঁতা আওয়াজ তুলে বারিধারা। শীতল হয়ে এসছে সকালের তীব্র দাবদাহ। স্লাইডিং ডোরের দিকে চোখ চলে যায় অনির। দরজার উপরে সাঁটান বড় হরফের ‘প্রশিক্ষকের অনুপস্থিতিতে পানিতে নামা নিষেধ’ লেখাটা দেখে অজান্তেই হাসে অনি। সবাই জানে কে কেমন সাঁতাড়ু। প্রশিক্ষকেরা ভালই জানেন আর আনাড়িদের ছেড়ে দেন না কখনোই। কিন্তু তার মত নিয়মিত সাঁতাড়ুদের জন্যে এসব নিয়ম অনেক শিথিল। অনির মত জলজদের কেউ পানিতে থাকলে বরং অন্যদেরকে নিরাপদ ধরে নিয়ে হালকা থাকেন অনেকেই।
আচ্ছা, এখন যদি ও পানির নিচে থেকে যায়? নিজের দম ধরে রাখার ক্ষমতা সম্পর্কে ভালই ধারণা আছে ওর। কিন্তু যদি ও দম ফুরিয়ে যাবার পরেও না ওঠে। ধরা যাক দেখতে চায় নিজের লিমিট টা ঠিক কতখানি… এখন কারো আসবার কথা নয়। প্রশিক্ষক যিনি ছিলেন ওপাশে গিয়ে গল্পগুজবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মনে হয়। এই ঝুম বৃষ্টির দিনে একা একা বসে থাকতে কে চায়, বিশেষত পানিতে নামার প্রয়োজন যেখানে নেই? দেয়ালের ঘড়িটায় বাজে সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা, আরো আধা ঘন্টা বাকি অন্যগ্রুপের সাঁতাড়ুদের পৌঁছুতে…
ছাদের দিকে তাকিয়ে বড় করে একটা শ্বাস নেয় অনি, ঝুম ঝুম বৃষ্টি, কী সুন্দর বৃষ্টির নকশা ছাদে! ভেতরের আঁধার তীব্র হয়, পানিতে নকশারা হয় গাঢ, কী সুন্দর! দেখতে দেখতে ডুব দেয় অনি। কী অসহ্য সুন্দর!
৭.৭.১০ বিকেল ৪:৩০
মন্তব্য
বদ মহিলা! এর কোনও মানে হয়? :-W :-L
-----------------------------------------------------------------------------------
...সময়ের ধাওয়া করা ফেরারীর হাত থিকা যেহেতু রক্ষা পামুনা, তাইলে চলো ধাওয়া কইরা উল্টা তারেই দৌড়ের উপরে রাখি...
**************************************************
“মসজিদ ভাঙলে আল্লার কিছু যায় আসে না, মন্দির ভাঙলে ভগবানের কিছু যায়-আসে না; যায়-আসে শুধু ধর্মান্ধদের। ওরাই মসজিদ ভাঙে, মন্দির ভাঙে।
মসজিদ তোলা আর ভাঙার নাম রাজনীতি, মন্দির ভাঙা আর তোলার নাম রাজনীতি।
সব কিছুরই কি কোন মানে থাকতে হয়??
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
সুন্দর তো !
ধন্যবাদ!
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
মন খারাপ করে দিলে।
বানান
_____________________
আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।
হুম। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে নয় যদিও। জমে ছিল লেখাটা, শেষ করলাম।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
(সম্পাদিত)
লেখাটায় বেশ কিছু টাইপো, বানান ভুল, আর দু'একটা পুনরাবৃত্তি চোখে পড়েছে। প্রিয় লিখিয়ে বুনোহাঁসকে অনেক ধন্যবাদ বানানগুলির তালিকা বানানালয়ে তৈরি করে এখানে তার লিঙ্কটা দিয়ে দেবার জন্যে। পরে কখনো সুযোগ পেলে এডিট করে দেব।
লেখাটা প্রথমে ১৪.৮.১০ তারিখ, সকাল সাতটার দিকে প্রকাশিত হয়েছিল। অতিথি হিসেবে লেখা সম্পাদনার সুযোগ নেই, কিন্তু সচল টিম আজকে লেখার শুরুতে কবিতাটার অংশ সংযোজিত করে দেবার আমার অনুরোধ রক্ষা করায় মনে হয় লেখাটা দুইদিন পরে আবার নীড়ে চলে এসেছে, দুঃখিত।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
হুম।
আমার মনে হয়, অনির একটা হালকা ভুল হয়ে যাচ্ছে। ওর আসলে দরকার, এই এক গুষ্টি বন্ধু-বান্ধব আর বাপ-মা কে কষে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিনে একবেলা নিয়ম করে পানিতে চোবানো। বোঝাই যাচ্ছে, অনির মাথায় যথেষ্ট ইভল স্কিমের অভাব রয়েছে। ওর দরকার একজন 'গাইড টু ইভল' বন্ধু আর কি।
আমার নাম্বারটা দিয়ে দেখো তো...
............................................................................................
স্বপ্ন আমার জোনাকি
দীপ্ত প্রাণের মণিকা,
স্তব্ধ আঁধার নিশীথে
উড়িছে আলোর কণিকা।।
............................................................................................
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক্ চিনে।
হা হা হা! আসলেই!
এটা লিখেছিলাম এক বর্ষা বিকেলে। পুরোনো এক বর্ষা সাঁঝের অনুভূতি নস্টালজিক করেছিল তাই। শেষটা জানা ছিল। কিন্তু আমি নিজে খুব আশাবাদি মানুষ তাই নেগেটিভ জিনিস লিখতে আমার কষ্ট হয়, এইটা শেষ করতে পারছিলাম না কিছুতেই, আর এটার জন্যে আরো কিছু লেখা আটকে ছিল। মনে হয় আরেকটা বর্ষা বিকেল দরকার ছিল, তাই কালকে একটানে শেষ করে দিয়ে দিলাম। একটু ঘষা-মাজা করতে পারলে ভাল হত। বেশি বড় হয়ে গেছে। থাক আপাতত এভাবেই।
আর অনির ভাবনায় বন্ধুরা আসবার কারণ মনে হয় লিখবার সময় আমি 'বন্ধুত্ব' নিয়ে ভাবছিলাম।
অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। আর আচ্ছা দেখি নম্বরটা দিয়ে দিতে হবে! কিন্তু ধর অনি কী ভাবছিল তা লিখেছি, কিন্তু আসলে কী করেছিল, বা আসলে শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, সেটা কিন্তু লিখি নাই! ঐটা কিন্তু পাঠকের
উপরে নির্ভর করছে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
আমি নিজের মতো করেই একটা শেষ ভেবে নিলাম।
______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না
______________________________________
যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ শেষ হয় না
এই অসমাপ্ত সমাপ্তিটা টানতে আমার নিজের অনেক কষ্ট হয়েছে, অনেকবার লিখতে শুরু করেও বাদ দিয়েছি। হয়ত এটাকে আরো অনেক অসমাপ্ত গল্পের মতই ধুলো জমতে দেয়া উচিত ছিল কোন এক কোণে... কিন্তু নস্টালজিয়া খুব বাজে জিনিস...
তবে এতো গল্প... আর গল্প চিরকাল তোমার আমার মত করেই শেষ হবে ওডিনদা। ঠিক যেমন ভাবে আমরা চাই, কল্পনা করি! But fact will always be stranger than fiction!
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
___________________
ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্নরাই সব জাগিয়ে রাখে।
নতুন মন্তব্য করুন