নীড়পাতা | সন্দেশ | লিংকস | আড্ডাঘর

Primary Links:

‹ পুরোনো ব্লগসব ব্লগনতুন ব্লগ ›

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রন্থিত বক্তৃতা :: মানুষটিই শিল্পী


লিখেছেন পলাশ দত্ত (তারিখ: সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৫:৪৬)
ক্যাটেগরী: | | | |

১৯৩২ সালে ভারতের বরোদায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। শিরোনাম ছিলো MAN THE ARTIST. বক্তৃতাটি তিনি দিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায়। এই বক্তৃতাটি রবীণ্দ্রনাথের ইংরেজি লেখার কোনো সংকলনেও নেই। ভারতের আহমেদাবাদের প্রফেসর নিরঞ্জন ভগত ও শৈলেশ পারেখ এটি খুজে বের করেন আমেরিকান পেনসেলাভানিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই লেখাটি সেই বক্তৃতারই ভাষান্তর এই লেখাটি আমার নয়। তবু কিছু অংশ তুলে দিলাম- সচলায়তনের পাঠকদের ভালো লাগতে পারে ভেবে।

==========

মানুষটিই শিল্পী
ভাষান্তর : আহমেদ মুনিরউদ্দিন ও মৃন্ময় রোকন

বিবর্তনের এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে মানুষ আর চার পেয়ে জন্তু হয়ে থাকতে চাইলো না। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিজের দেহকে সে যে-রূপে বদলে নিল তার মধ্যে রয়ে গেলো অধীনতার বিরুদ্ধে এক স্থায়ী অবাধ্যতা। আমাদের লম্বা দেহকাণ্ডের সঙ্গে অসম দুই জোড়া পা আর সবার শেষে ভারী একটা মাথা জুড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটা প্রকৃতির নিজের খেয়ালেই হয়েছে কি না- এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলে না। মাধ্যাকর্ষণের টানে চলাফেরায় যে-মুশকিল তা থেকে উৎরাতে পৃথিবীর সঙ্গে প্রাণীর ঐতিহাসিক সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়েই এটা হয়েছে। কিন্তু মানুষ যে ওই সহজাত ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল এ ঘটনাটিই নিজের গঠনের বারংবার রূপান্তরের বিষয়ে তার জন্মগত আকাঙ্খার প্রমাণ। প্রকৃতির প্রতিটি প্রস্তবনাকেই যেন সে বারবার নিজের মতো করে শুধরে নিতে চেয়েছে।
একটা চারপায়ার টেবিলের দুটি পা ওপরের দিকে তুলে দেওয়া, আর বাকি পা দুটি যেন বোকার মতো দুপাশে ঝুলে আছে। এমন একটা টেবিল দেখতে পেলে হয় আমাদের মনে হবে যেন আমরা দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি অথবা আসবাবটির এরকম অযৌক্তিক গঠন দেখে এর নির্মাতার ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব চিন্তা করে আমাদের হাসি পাবে। মানুষের প্রায় ওই একইরকম অর্থহীন দেহগঠন আমাদের মনে এ ভাবনা সঞ্চার করতে পারে যে কোনো এক অবাধ্য গ্রহের প্রভাবেই যেন তার জন্ম হয়েছিল; যে প্রকৃতির বেধে দেওয়া কপথের বিপরীতে নিজের অদ্ভুৎ পথে চলতে চেয়েছে। এ বিষযটি গুরুত্বপূর্ণ যে প্রাণীর চলাফেরার চিরায়ত নিয়মটির বিরোধিতা করার কারণে প্রতি পদে শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও মানুষ নিজের ঝুঁকি নেবার প্রবণতায় অটল থেকেছে। এ বিরুদ্ধ পরিস্থিতি পেরোতে সে অর্ধেকটা সফল হয়েছে তার পেশীর সহজ ভারসাম্যের গুণে আর বাকীটা পেরোতে মানবাতিহাসের পুরোটা শৈশব তাকে চলতে হয়েছে টক্কর খেতে খেতে। অপর্যাপ্ত সম্বল নিয়েই বিপজ্জনক সব পরীা পাড়ি দিয়ে অল্প অল্প করে সাফল্যের পথে। আর সারা জীবনভর আকস্মিকভাবে পড়ে গিয়ে যে কোনো মারাত্মক আঘাত কিংবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার দায় তাকে বহন করতে হয়েছে। অথচ প্রকৃতির বশংবদ চারপেয়েরা এসব ঝুঁকি থেকে মুক্ত। নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সহজাত সুরার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, চারপায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে ধরার ধূলিকে সর্বময় জ্ঞান করে প্রতি পদে পদে সেলাম না করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টাতেই মানুষের বিস্ময়কর অভিযাত্রার শুরু।
আনুভূমিক অবস্থা থেকে নিজের দেহের উল্লম্ব উত্থানে মানুষের শারীরিক ও মানসিক চরিত্রে এক নবযুগ চলে এল। প্রথমেই খুলে গেল তার দৃষ্টির সীমানা, দেখবার স্বাধীনতা। এ শুধু দেখার শরীরী মতার বিষয় নয়। অন্য অনেক প্রাণীর দেখার মতা আরও বেশি, এ বিষয়ে তারা আরও পটু। কিন্তু, দেহকাণ্ডের ওপরে আমাদের মাথার অবস্থানের কারণে আমরা যে দৃষ্টিসীমা পেলাম তা শুধু অন্যান্য বস্তু সম্পর্কে আমাদের তথ্যই দিল না; বরং বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে ঐক্য, আন্তঃসম্পর্ককে আমরা আবিস্কার করলাম। আমাদের দৃষ্টিসীমার কারণে পাওয়া এ পর্যবেণ মতা খুব প্রয়োজনীয় মনে না হলেও এটা আমাদের কল্পনাশক্তির বিকাশে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুর অবস্থান চিহ্নিত করার চেয়ে এ দৃষ্টিমতা অনেক বেশি ভূমিকা রেখেছে ভাবনা গঠনে। এটা আমাদের মনোজগতের রসদ জুগিয়েছে। উল্লম্ব উত্থানের মধ্য দিয়ে দৃষ্টিসীমার স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের চোখ এ মনোজগতের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হিসেবে তার ভূমিকা রেখেছে।
নিজের সব মতার মধ্যে কল্পনাশক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এটা তার নিজেকে সম্পূর্ণ করবার হাতিয়ার। সমস্ত প্রাণীকূলের মধ্যে মানুষকেই যেন তার নির্মাতা অসম্পূর্ণ করে রেখেছিলেন। মানুষের কোমল ত্বক অনাবৃত ও অসজ্জিত, কঠোর খুলি দিয়ে ঢাকা একমাত্র মস্তকটি ছাড়া তার নরম শরীর অরতি এবং হাতিয়ারহীন। চিতার মতো প্রখর দৃষ্টি, কুকুরের মতো প্রবল ঘ্রানশক্তি, হরিণের মতো খিপ্র গতি কিংবা হাতির মতো বিপুল পেশীশক্তি আর ধ্বংস করবার মতা মানুষের নেই। কিন্তু, শুধু এসব মতার ঘাটতিই তার মুশকিল নয়। বরং এসব ঘাটতির ওপর আবার চালিকাশক্তি হিসেবে একটা মন থাকাটাই তার বড় বিপত্তি। যে মনের পুরো শক্তি নির্ভরযোগ্য প্রবৃত্তির বশে নেই এবং তার নিয়ন্ত্রণও মানে না। আর তাই সে একে অন্যের নিত্য বিরোধিতার মধ্যে থাকে। মানুষ এমন এক সমস্যার নাম যার সমাধান কেবল সে নিজেই করতে পারে। তার নিজের চারিত্র্য-নকশা তার নিজেকেই বানিয়ে নিতে হয়েছে এবং এক কঠিন সম্পূর্ণতার ধারণার দিকে তার নিজেকে নিয়ে যেতে হয়েছে। আর সাফল্য ব্যর্থতার বন্ধুর পথ ধরে কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ ধরে মাহাকালের আবর্তে এ প্রক্রিয়া চলেছে।

(অসম্পূর্ণ)


গড় রেটিং
( ভোট)
লিখেছেন পলাশ দত্ত (তারিখ: সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৫:৪৬)
উদ্ধৃতি | পলাশ দত্ত এর ব্লগ | ১২টি মন্তব্য | ১৪৯বার পঠিত

Views or opinions expressed in this post solely belong to the writer, পলাশ দত্ত. Sachalayatan.com can not be held responsible.

রাফি এর ছবি
১ | রাফি | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৫:৫৫

পলাশ দা লেখা পড়লাম। বেশ গভীর কথাগুলি। ভাল লাগল।

তবে লেখাটার সূত্র ঠিক বুঝলাম না। অগ্রন্থিত বক্তৃতা মানে তো এটি রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা?
না কি ভুল বুঝলাম?

যদি রবীন্দ্রনাথের লেখাই হয় তবে ভাষান্তরের প্রশ্ন আসছে কেন? মূল বক্তৃতাটি তিনি কোথায় দিয়েছিলেন?

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!


পলাশ দত্ত এর ছবি
২ | পলাশ দত্ত | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৫:৫৮

বোকামিটা আমারই হইছে। আমি বিষয়টা লেখার মধ্যেই পরিষ্কার করে দিচ্ছি দাড়ান।


রাফি এর ছবি
২.১ | রাফি | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৬:০৭

ধন্যবাদ পলাশ ভাই।
সব ফকফকা!

---------------------------------------
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে;
সে কেন জলের মতন ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!


রেজওয়ান এর ছবি
৩ | রেজওয়ান | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৭:০০

ধন্যবাদ এটি পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্যে।

পৃথিবী কথা বলছে আপনি কি শুনছেন?


পলাশ দত্ত এর ছবি
৩.১ | পলাশ দত্ত | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৭:৫০

সু+আগমন = স্বাগতম হয়? না হলেও আপনাকে সু+আগমন।


ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি
৪ | ফারুক ওয়াসিফ | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৭:৫৭

কাজটা প্রশংসনীয়। কিন্তু অনুবাদে আরেকটু যত্ন নেয়ার দরকার ছিল। ভাষায় রাবীন্দ্রিক মায়া না থাকুক, কিছুটা সুষমা থাকা দরকার ছিল। আর মানুষটি শিল্পী না বলে মানুষই শিল্পী বলা যথাযথ হতো না। ঠাকুর মহাশয় তো কোনো বিশেষ মানুষ নিয়ে বলেননি, বলেছেন নির্বিশেষ মানুষের সহজাত প্রবণতা নিয়ে। ঠিক বললাম কি?


পলাশ দত্ত এর ছবি
৫ | পলাশ দত্ত | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৮:০৩

ভাষার বিষয়টা নিয়ে আসলেই ভাবার দরকার। ক্যানো রাবিন্দ্রীক সুষমা নেই এতে সে-বিষয়ে একটা আলোচনা করবো। তাহলে প্রাচীনতর লেখকদের লেখার এখনকার পাঠ ক্যামন হ্ওয়া উচিত সে-বিষয়ে একটা পথ খুজে পাওয়া যেতে পারে।

আর ‌'মানুষটিই' বলার কারণটা হয়তো এই যে নানা যে-প্রাণীকূল তার মধ্যে 'মানুষ' একটি প্রাণীকূল। এই 'মানুষটিই' শব্দটির লক্ষ্য হচ্ছে মানুষ নামের প্রজাতিটিকে দৃঢ়ভাবে স্পর্শ করার একটা চেষ্টা চালানো।


ফারুক ওয়াসিফ এর ছবি
৬ | ফারুক ওয়াসিফ | সোম, ২০০৮-০৯-০৮ ১৮:৪৪

মানুষ এক নির্বিশেষ বচন, একে বিশেষ করলে সমগ্র মানুষ বুঝায় না। তা না বুঝালে যে কোনো মানুষ শিল্পী হতেই পারে, কিন্তু মানুষ মাত্রই শিল্পী এই জ্ঞান আসে না। এইটাই বলতে চাইছিলাম। বাকি বিষয়ে প্রয়াস নিলে ভাল হয়। আপনিই শুরু করেন না।


রণদীপম বসু এর ছবি
৭ | রণদীপম বসু | মঙ্গল, ২০০৮-০৯-০৯ ০০:২৬

ভালো লেগেছে লেখাটা। ধন্যবাদ। তবে আগামী পর্বে আশা করছি অসম্পূর্ণতাটা পূর্ণ করে দেবেন।
অনেক শুভেচ্ছা।


১০

দেবোত্তম দাশ এর ছবি
৮ | দেবোত্তম দাশ | মঙ্গল, ২০০৮-০৯-০৯ ০১:০৬

আরো একটা ভালো লেখা, পরের পর্ব আশা করছি শীঘ্র।
------------------------------------------------------
স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছি বলেই আজো বেঁচে আছি


১১

তানবীরা এর ছবি
৯ | তানবীরা | মঙ্গল, ২০০৮-০৯-০৯ ০৩:২৭

আমি নেদারল্যান্ডস টিভির সাথে রবি ঠাকুরের উপড় একটা প্রোগ্রামে কাজ করেছিলাম, সেখানে তার নিজের গাওয়া গানের ভিডিও, তিনি নেদারল্যান্ডস বেড়াতে এসেছেন সেই ভিডিও, এসে এখানকার চার্চে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন সেই ভিডিওগুলো দেখেছিলাম। শরীরে অন্যরকম একটা কাপুনিমতো অনুভুতি হচ্ছিলো তখন।

তানবীরা
---------------------------------------------------------
চাই না কিছুই কিন্তু পেলে ভালো লাগে


১২

পলাশ দত্ত এর ছবি
১০ | পলাশ দত্ত | মঙ্গল, ২০০৮-০৯-০৯ ১৩:৪৩

@রণদীপম ও দেবোত্তম

ধন্যবাদ ধন্যবাদ। পরের পর্ব আসছে দু'তিন দিনের ভেতর।


@তানবীরা

নেদারল্যান্ডের চার্চে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতাটার কোনো অডিও/ভিডিও কপি যোগাড় করা যায়?

আপনি যে-প্রোগ্রামে কাজ করেছিলেন একটু সবিস্তারে বলবেন সেটা?


নতুন মন্তব্য করুন

এই ঘরটির বিষয়বস্তু গোপন রাখা হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না।
ফায়ারফক্সান » কেন?

লগইন করুন